সুশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়াটাই আসল
আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু ডিগ্রি, সার্টিফিকেট বা উচ্চ চাকরির পদবীই শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। আসল শিক্ষা হলো সুশিক্ষা—যা মানুষকে নৈতিকতা, সততা, মানবতা ও দায়িত্বশীলতার পথে পরিচালিত করে। সুশিক্ষা শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, এটি চরিত্র গঠন, সমাজসেবা ও আত্মসম্মানবোধের সমন্বয়। এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব কেন সুশিক্ষাই আসল এবং কীভাবে এটি আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে।
১. সুশিক্ষার সংজ্ঞা ও গুরুত্ব
সুশিক্ষা বলতে এমন শিক্ষাকে বোঝায় যা ব্যক্তিকে জ্ঞানের সাথে সাথে নৈতিক মূল্যবোধ শেখায়। এটি শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য মুখস্থ করা নয়, বরং সঠিক-ভুলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, "শিক্ষা হলো জাতির মেরুদণ্ড।" কিন্তু যে শিক্ষা নৈতিকতা ছাড়া তা শুধু অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, জাতির উন্নয়ন হয় না।
সুশিক্ষিত ব্যক্তি সমাজের জন্য সম্পদ। তিনি চুরি, মিথ্যা, দুর্নীতি থেকে দূরে থাকেন এবং অন্যের অধিকার রক্ষা করেন। আজকের সমাজে ডাক্তারের কাছে ভুল চিকিৎসা, শিক্ষকের কাছে অনৈতিকতা, রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি—এসবের মূল কারণ সুশিক্ষার অভাব। সুশিক্ষা মানুষকে মানুষ করে।
২. চরিত্র গঠনের ভিত্তি
সুশিক্ষার প্রথম লক্ষ্য চরিত্র গঠন। সততা, সহানুভূতি, ধৈর্য, ক্ষমা—এগুলো কোনো ডিগ্রি দিয়ে শেখানো যায় না। বাল্যকাল থেকেই পরিবার, স্কুল ও সমাজ এই গুণাবলী গড়ে তোলে। রাসেল বলেছেন, "শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো জ্ঞান অর্জন নয়, চরিত্র গঠন।"
একজন সুশিক্ষিত ব্যক্তি কখনো অবৈধ উপায়ে ধনী হতে চান না। তিনি পরীক্ষায় চিটিং করেন না, বন্ধুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন না। বাংলাদেশে অনেক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন কারণ তাদের সুশিক্ষার অভাব। সততা ও নৈতিকতা ছাড়া জ্ঞান অন্ধ।
৩. সমাজ ও দেশের উন্নয়ন
সুশিক্ষিত ব্যক্তিরা সমাজের আলো। তারা পরিবেশ রক্ষা করেন, দরিদ্রের সাহায্য করেন, নির্যাতিতদের পক্ষে কথা বলেন। গান্ধীজি বলেছেন, "শিক্ষিত হওয়া মানে ডিগ্রি লাভ নয়, সমাজের জন্য কাজ করা।" বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু, ড. মুহাম্মদ ইউনূস—তারা সুশিক্ষিত কারণ তারা জ্ঞানের সাথে মানবতা যুক্ত করেছেন।
আজকের যুবকরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় নষ্ট করে কিন্তু সমাজসেবা করে না। সুশিক্ষা তাদেরকে দায়িত্বশীল নাগরিক করে তোলে। একজন সুশিক্ষিত ডাক্তার রোগীকে সঠিক চিকিৎসা দেয়, শিক্ষক ছাত্রকে সত্য পথ দেখায়। এটিই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন।
৪. মানসিক স্বাস্থ্য ও সুখ
সুশিক্ষা মানসিক শান্তি দেয়। লোভ, হিংসা, অহংকার থেকে মুক্তি পায়। ধ্যান, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা শেখায়। আজকের যুবকরা ডিপ্রেশন, উদ্বেগে ভুগছে কারণ তাদের শুধু প্রতিযোগিতামূলক জ্ঞান আছে, নৈতিক ভিত্তি নেই। সুশিক্ষিত ব্যক্তি সুখী কারণ তার মনে শান্তি।
৫. পরিবার ও সম্পর্কের ভিত্তি
সুশিক্ষিত ব্যক্তি পরিবারের স্থানীয় সদস্য। স্ত্রী-সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল, বাবা-মায়ের সেবা করে। বন্ধুবান্ধবের প্রতি বিশ্বস্ত। বিবাহবিচ্ছেদ, পরিবার ভাঙনের অনেক কারণ নৈতিকতার অভাব। সুশিক্ষা সম্পর্ককে মজবুত করে।
৬. অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সফলতা
আশ্চর্যজনকভাবে সুশিক্ষিত ব্যক্তিরা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে সফল হয়। তারা দুর্নীতি করে না, কঠোর পরিশ্রম করে। বিল গেটস বলেছেন, "সফলতা আসে সততা ও কঠোর পরিশ্রম থেকে।" বাংলাদেশে অনেক সুশিক্ষিত ব্যবসায়ী, কৃষক সফল হয়েছেন কারণ তাদের নৈতিক ভিত্তি ছিল।
৭. সুশিক্ষার উৎস
সুশিক্ষা আসে পরিবার থেকে। বাবা-মা নিজেরা সততা প্রয়োগ করলে সন্তান শেখে। স্কুলে নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের ভালো উদাহরণ অনুসরণ করা দরকার। সরকারের উচিত সুশিক্ষাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা।
উপসংহার
সুশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়াটাই আসল। ডিগ্রি দিয়ে পেট ভরে না, চরিত্র দিয়ে সম্মান আসে। একজন সুশিক্ষিত ব্যক্তি সমাজের আলো হয়ে ওঠে, দেশকে এগিয়ে নেয়। আজ থেকেই সিদ্ধান্ত নিন—আপনার শিক্ষা জ্ঞানের সাথে নৈতিকতায় সমৃদ্ধ করুন। সুশিক্ষাই জীবনের সফলতা, সুশিক্ষাই জাতির মর্যাদা। আল্লাহ আমাদের সকলকে সুশিক্ষার পথে পরিচালিত করুন। আমীন।